মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে অন্তর্বর্তী সরকার। নীতি সুদহার (রেপো রেট) কয়েক দফা বাড়িয়ে তোলা হয়েছে ১০ শতাংশে। এতে ব্যাংকভেদে ঋণের সুদহার উঠে দাঁড়িয়েছে কম-বেশি ১৫-১৬ শতাংশে। পুঁজি সংস্থানের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প খাতের উৎপাদনকে চাপে ফেলছে জ্বালানি সংকট। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গ্যাস সংকটে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে পরিচালন ও মাথাপিছু ব্যয় বাড়ছে ব্যবসার। এর মধ্যেই শিল্প খাতে করভার ও শুল্কচাপ বাড়ছে। শিল্প খাতে শ্রম অসন্তোষ, আমদানির বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতা, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি ইত্যাদিরও প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতের ব্যয় ও উৎপাদনে। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে শিল্প খাতের উৎপাদন। যদিও ব্যবসা পরিচালনার খরচ এখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
আমদানিনির্ভর শিল্প খাতগুলোর জন্য এ ব্যয়কে আরো বাড়িয়ে তুলছে ডলারের বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দিন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১১৮ টাকা। এর ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় গতকাল তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকায়।
খাতসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় দেশের শিল্প খাতের গত ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এতে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে শিল্পে উৎপাদন কমেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। আর গোটা খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ।
শিল্প উৎপাদনে ব্যবহার্য গ্যাসের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছিল পতিত বিগত সরকার। দাম বাড়িয়েছিল বিদ্যুতেরও। শুল্ক-করের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বোঝার সঙ্গে ছিল পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির মতো অনানুষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়ের চাপও। এ ব্যয়চাপকে আরো ভারী করে তুলছিল বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা, ডলার সংকট, পুঁজি সংস্থানের খরচসহ সার্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রতিকূল পরিস্থিতি। তবে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করে। ব্যবসার ন্যায্য ও অনুকূল পরিবেশ গড়ে ওঠার পাশাপাশি ব্যয়চাপ কমতে যাচ্ছে বলে মনে করছিলেন ব্যবসায়ীরা। যদিও গত ছয় মাসের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যবসার খরচ আরো বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদহার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত সেভাবে কার্যকর না হলেও তা বিনিয়োগের গতিকে কমিয়ে দিচ্ছে। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের বিকাশের পথে অন্তরায় তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই শিল্প খাতকে চাপে ফেলছে জ্বালানি সংকট, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিল্প খাতের সার্বিক অস্থিরতা ও ডলারের বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যয়সহ ভিন্ন ভিন্ন চার্জ মিলিয়ে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। দিন শেষে এর সঙ্গে উৎপাদন হ্রাসের বিষয়টিও যোগ হয়েছে। সব মিলিয়েই উৎপাদন ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিল্পের জন্য বার্তাটি খুব পরিষ্কার। আর সেটি হলো সরকার এখন শিল্প চাচ্ছে না। তাদের উৎপাদনমুখী শিল্পের প্রয়োজন নেই। আমি নিশ্চিত যে বিষয়গুলো নীতিনির্ধারকরা ভাবছেন না। কিন্তু যারা এ ধরনের প্রস্তাব দিচ্ছে, তাদের খারাপ উদ্দেশ্য আছে। বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী শিল্প হয়েছে, কারখানা গড়ে উঠেছে সস্তায় গ্যাস প্রাপ্যতার কারণে। অন্যথায় দেশে সবকিছুই ব্যয়বহুল। জমির দাম বেশি। অবকাঠামো আমাকে করতে হয়। শিল্প গড়তে গেলে ৩০-৪০ শতাংশ ব্যয় হয় অবকাঠামো উন্নয়নে। এরপর মেশিনারিজ স্থাপন করতে হয় স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের মাধ্যমে, যার আবার সুদহার বেশি। আবার বলা হয় শ্রম ব্যয় কম, কিন্তু উৎপাদনশীলতা হিসাব করলে শ্রমও সস্তা নয়। এসবের ব্যয়ভার টানার সক্ষমতা বস্ত্র ও পোশাকের মতো শ্রমঘন শিল্পগুলোর নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘সব দিক বিবেচনায় বলা যায় এ দেশে শিল্প গড়ে উঠুক এটা কেউ চাচ্ছে না। সরকার এ ধরনের উদ্যোগ কেন নিচ্ছে? কারণ তারা দেখছে রাজস্ব আহরণ হচ্ছে না। যদিও এর জন্য করজাল সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। অল্পকিছু ভ্যাটের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, কিন্তু ভ্যাট গ্রহণের যে যন্ত্র বা পজ মেশিন সেটাও দেয়া হচ্ছে না। এদিকে আবার ভ্যাট সংগ্রহ করা যাচ্ছে শুধু যারা পজ মেশিন ব্যবহার করেন, তাদের থেকেই। এখন চাঁদাবাজি বন্ধ করা দরকার হলেও সেটি করা হচ্ছে না। খাদ্য মূল্যস্ফীতি না কমিয়ে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হবে তা বোধগম্য নয়। সুদহার যখন বাড়ছে তখন কাঁচামাল, মেশিনারিজ আর নিত্যপণ্যের আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। দেশে আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে উঠেছে। এর ব্যয়ভার যদি বাড়ানো হয়, তাহলে আমদানিমুখী হওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।’
বিসিআইয়ের পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, দেশের বস্ত্র শিল্পের উৎপাদন ব্যয় গত ছয় মাসে বেড়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৮ শতাংশ। চামড়া খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। খাদ্যপণ্যে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১১ শতাংশ। কোমল পানীয় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১৩ শতাংশ এবং তামাক পণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১৮ শতাংশ।
এসব পর্যালোচনা কম-বেশি মাত্রায় গ্রহণযোগ্য বলেই মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। যদিও ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, তাদের প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশেরও অনেক বেশি। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির সক্রিয় এক সদস্য ও দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওষুধের কাঁচামাল আমরা ডলারে কিনে আনি। আর ওষুধ বিক্রি হয় টাকায়। ধরে নেয়া যাক একটা কাঁচামালের দাম আগে ছিল প্রতি কেজি ১ ডলার। সেক্ষেত্রে যেখানে আগে আমার প্রতি কেজি কাঁচামালের দাম ৮৬ টাকা ছিল, সেটি এখন হয়েছে ১২৩ টাকা। এ হিসেবে শুধু ডলারের বিনিময় হার বাড়ার কারণেই ব্যয় বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। জ্বালানিসহ সব খরচ বেড়েছে। আগে আমাদের প্রতিষ্ঠানে খরচ হতো মাসে ৯ কোটি টাকা। এখন হয় ২১ কোটি টাকা। শ্রমিকদের বেতনও সম্প্রতি ৩০-৪০ শতাংশ বেড়েছে। আগে মাসে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাবদ ব্যয় হতো ২ কোটি টাকা। এখন দিতে হয় ৯ কোটি টাকা।’
দুই বছর আগে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ১৫০ থেকে ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। এরপর ২০২৪ সালেও দাম বাড়ানো হয়। অতিসম্প্রতি আবারো মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। এতে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৩০ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা ৭২ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে পুরো গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হবে নতুন দামে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের রাজস্বের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একই সঙ্গে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগও তো শক্তভাবে নিতে হবে। শুধু সুদহার বাড়িয়ে তো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। একদিকে চাঁদাবাজি যেমন বন্ধ হয়নি, অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম আরো বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে, এটি আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। স্থানীয় উৎপাদনকে এ ধরনের পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত করবে।’
গ্যাসের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না হওয়ার কারণেও কোম্পানিগুলোকে নানা ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে জানিয়ে কৃষিজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, চিনি এসব পণ্যের মূল্য বিবেচনায় খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় অন্তত ৫ শতাংশ বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদন খাত বিবেচনায় নিলে ব্যয় বৃদ্ধির হার ১৫ শতাংশের নিচে হবে না। ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ শিল্প-কারখানা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে না পারা। আমাদের প্রতিষ্ঠান সচল থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের কারখানা নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল থাকতে পারেনি। বিশেষ করে শ্রমঘন শিল্পের বিষয় বিবেচনায় নিলে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির হার ক্ষেত্রবিশেষে ১৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।’
গতকালই ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ফ্রিজার, রেফ্রিজারেটর, মোটরসাইকেল, এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ও কম্প্রেসার উৎপাদন এবং সংযোজনে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট আয়কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানে বলা হয়েছে, এসব ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ও মোটরযান উৎপাদনকারীদের ২০৩২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংশোধিত হারে কর পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ অটোমোবাইলস অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএএমএ) সভাপতি হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার শিল্প সহায়তা অব্যাহত রাখার দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে আসতে চায়। আবার পরিবেশবান্ধব যান উৎপাদনেও সরকারের উৎসাহ রয়েছে। তাই আমি মনে করি পরিবেশবান্ধব যানবাহনে আয়কর আরোপ না করলে ভালো হয়।’
রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার পণ্য উৎপাদনকারী ইলেকট্রো মার্ট গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নুরুল আফছার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একবারে এত বেশি পরিমাণে করারোপ না করে যদি ধাপে ধাপে করত তাহলে উপকৃত হতাম আমরা। অর্থনীতির গতি এখন এমনিতেই শ্লথ। এর মধ্যে করারোপের প্রভাবে আরো শ্লথ হবে। নতুন বিনিয়োগও কমবে। আর পণ্যের ওপরও প্রভাব পড়বে। ডলারের বিনিময় হার, পরিবহনসহ নানা খাতে গত ছয় মাসে ব্যবসার খরচ এমনিতেই বাড়ন্ত। বছর শেষে ইনক্রিমেন্টও দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়েছেই।’
উৎপাদিত ও আমদানীকৃত পণ্য সারা দেশে বাজারজাত করতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। এসব পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। গত ছয় মাসে চাঁদাবাজ চক্র সদস্যদের বদল ঘটলেও চাঁদাবাজি কমেনি বলেও অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা। আবার মূল্যস্ফীতির চক্রাকার প্রভাবও ব্যবসার খরচ বাড়িয়েছে বহুলাংশে। শিল্প এলাকাগুলোয় বিচ্ছিন্ন কিন্তু নিয়মিতভাবে অসন্তোষ দেখা গেছে গত ছয় মাসে, যা প্রভাব ফেলেছে শিল্পের উৎপাদন খরচে।
দেশের বেভারেজ পণ্য বাজারজাতকারী বহুজাতিক কোম্পানিসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, ব্যবসার পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের প্রভাবক এখন ক্রিয়াশীল। তবে অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে যদি শুধু মুদ্রার বিনিময় হার এবং স্থানীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে থাকা কাঁচামালের দামকেও বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলেও ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে অন্তত ১৩ শতাংশ।
ব্যবসার পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাবজনিত ক্ষতি এখন ক্রমেই বাড়ছে বলে দাবি করছেন দেশের আরেক শ্রমঘন শিল্প চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন শিল্পের উদ্যোক্তারাও। লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) পরিচালক আবদুল মোমেন ভূইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ছয় মাসে খরচ অবশ্যই বেড়েছে। ন্যূনতম মজুরি বেড়েছে ৯ শতাংশ। বাস্তবে দক্ষতা বিবেচনায় এর বেশি দিতে হয়েছে শ্রমিকদের। ব্যাংক ঋণের সুদের হার এখন ১৩ বা ১৪ শতাংশ, যেটি আগে ছিল এক অংকের। এটাই সবচেয়ে বড় প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে ব্যবসার পরিচালন ব্যয়ে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় সুদহার বৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। এতে বিনিয়োগের গতি কমে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে উচ্চ সুদহার বিনিয়োগকে আরো নিরুৎসাহিত করবে। নতুন উদ্যোক্তাদের বিকাশও ব্যাহত হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য নীতি সুদহারের বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতি গ্রহণ করা জরুরি। প্রয়োজনে এসএমই এবং রফতানিমুখী শিল্পে বিশেষ সুদহার সুবিধা দিয়ে উদ্যোক্তাদের চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়টি অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে করছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গত ছয় মাসে ব্যবসার সব ধরনের খরচ বৃদ্ধি এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সংকট নিয়ে বেসরকারি খাতের উদ্বেগ অত্যন্ত যৌক্তিক। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, পণ্য উৎপাদন খরচের বাড়তি চাপ, মূল্যস্ফীতি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বেড়েছে, যা ব্যবসার লাভ কমিয়ে দিয়েছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষত, ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসাগুলোর পক্ষে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা আরো কঠিন হয়ে উঠছে। উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সুতরাং এ অবস্থায় ব্যবসায়িক পরিবেশ বজায় রাখা, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগজনক।’